রোহিঙ্গা: শরণার্থী প্রত্যাবাসনে ভারতের পক্ষে বাস্তবে কতটা কী করা সম্ভব?

রোহিঙ্গা: শরণার্থী প্রত্যাবাসনে ভারতের পক্ষে বাস্তবে কতটা কী করা সম্ভব?

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সাহায্য চাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই রোববার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সেনাপ্রধান একসঙ্গে এক বিরল সফরে মিয়ানমারে গিয়েছেন।

পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ও সেনাপ্রধান এম. এম. নারাভানের এই সফরে ভারত রোহিঙ্গাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারকে অনুরোধ করবে বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রেও সেরকমই ইঙ্গিত মিলছে।

ভারত জানিয়েছে, এই সফরে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর আং সান সু চি এবং সে দেশের সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ, সিনিয়র জেনারেল মিন অং লেইং-য়ের সঙ্গে তাদের আলোচনা হবে।

কিন্তু প্রতীকী আকারে কয়েকশো রোহিঙ্গাকে যদি মিয়ানমারে ফেরানো সম্ভবও হয়, তাহলেও ভারতের পক্ষে শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে সত্যিই কতটা কী করা সম্ভব তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে অনেকেই সন্দিহান।

গত মঙ্গলবার ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কনসাল্টেটিভ কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকের পর দুই দেশ মিলে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছিল।

তাতে বলা হয়, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানের ক্ষেত্রে ভারতকে তাদের ‘লেভারেজ’ প্রয়োগ করা, অর্থাৎ প্রভাব খাটানোর জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ. কে. আবদুল মোমেন।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ভারত যাতে তাদের বন্ধু দেশ মিয়ানমারকে চাপ দেয়, ঢাকা বহুদিন ধরেই দিল্লিকে সে কথা বলে আসছে – কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিবৃতিতে ‘লেভারেজ’ শব্দের ব্যবহার সম্ভবত এই প্রথম।

তারপর রোববার থেকে শুরু হওয়া ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব ও সেনাধ্যক্ষের মিয়ানমার সফরে ভারত অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করবে, জানাচ্ছেন দিল্লিতে সিনিয়র কূটনৈতিক সংবাদদাতা নয়নিমা বসু।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, “রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো কিন্তু মোদী সরকারেরও এজেন্ডার অংশ। ২০১৪ সালে তারা ক্ষমতায় আসার পরই সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলায় পরিষ্কার বলেছিল সব রোহিঙ্গাকে ফেরত যেতে হবে।”

“তখন থেকেই ভারত এ ব্যাপারে মিয়ানমারকে বলে আসছে যে উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেয়ার মধ্যে দিয়ে তারা এই প্রত্যাবাসনের পথ প্রশস্ত করতে চায়।”

“এমন কী এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাখাইন স্টেট ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্টের অধীনে ভারত সেখানে বহু আবাসন প্রকল্প তৈরি করেছে, স্কুলও বানিয়ে দিয়েছে।” “কিন্তু প্রশ্ন এটাই, এই সুবিধাগুলো নেবে কারা? এখনও তো সেগুলো কেউ ব্যবহার করতে পারছে না!”

“রোহিঙ্গারা ফিরে এলেও তারা যে মিয়ানমারে নিরাপদ একটা পরিবেশ পাবে, এই গ্যারান্টিটাই তো এখনও পাওয়া যায়নি। না ভারত, না বাংলাদেশ – কাউকেই সেই নিশ্চয়তা মিয়ানমার দিতে পারেনি, বা দেয়নি।”

আসলে রাখাইন প্রদেশে ভারত যে সব নতুন বাড়িঘর বানিয়ে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ ও ভারত – দুই দেশ থেকেই কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে হয়তো মিয়ানমার নিমরাজি হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। কিন্তু খুব বড় স্কেলে প্রত্যাবাসন যে এখনই সম্ভব নয়, সেটাই কূটনৈতিক বাস্তবতা।

মিয়ানমারে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, এখানে ভারতের খুব বেশি কিছু করার আছে বলে তিনি মনে করেন না।

তার কথায়, “আমার মনে হয় না মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এমন, যে তাদের ওপর আমরা লেভারেজ প্রয়োগ করতে পারি। বড়জোর হয়তো প্রত্যাবাসনের জন্য তাদের কাউন্সেল করতে পারি, পরামর্শ দিতে পারি।”

“আমার ধারণা, বাংলাদেশও সেটা জানে এবং তারা চায় আমরা এ ব্যাপারে যতটুকু সম্ভব ইতিবাচক ভূমিকা পালন করি, এই পর্যন্তই।”

“সুতরাং এই কনটেক্সটে লেভারেজ কিন্তু সঠিক শব্দ নয়। তবে এটা মানতেই হবে, রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গভীর উদ্বেগের একটা বিষয়।

“কিন্তু তারা যদি মনে করে ভারত এখানে যথেষ্ঠ করছে না, তাহলে এই প্রশ্নও উঠবে কে-ই বা করছে?”
অ্যাম্বাসাডর মুখার্জি আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “চীনও একটা পর্যায়ে এই সঙ্কটে হস্তক্ষেপ করেছিল – কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে ভিটো দেওয়া ছাড়া তারা কীই বা করতে পেরেছে?”

“রোহিঙ্গাদের ফেরানোর জন্য চীন সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে মিলেও একটা উদ্যোগ নিয়েছিল, তাতেও কোনও লাভ হয়নি।”

“আসলে যে কোনও প্রত্যাশাতেই বাস্তববাদ থাকতে হবে। আসিয়ান বা বিশ্বের অন্য বৃহৎ শক্তিগুলোও বা এ ব্যাপারে কী করছে?”

“ইসলামিক বিশ্বেরই বা ভূমিকা কী? হ্যাঁ, তারা বিষয়টা আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে নিয়ে গেলেও ওই মামলার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের কিন্তু কোনও সম্পর্ক নেই”, বলছিলেন গৌতম মুখোপাধ্যায়।

তবে এক্ষেত্রে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা অবশ্যই অনেক বেশি – কিন্তু ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব ও সেনাধ্যক্ষের মিয়ানমার সফরে সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

নয়নিমা বসুর কথায়, “এই প্রথম মিয়ানমারে এরকম একটা হাই-প্রোফাইল সফর হচ্ছে, যেখানে পররাষ্ট্র সচিব আর সেনাপ্রধান দুজনে একসঙ্গে যাচ্ছেন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অবশ্যই এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হবে।”

“ভারতের লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের কাছ থেকে এই আশ্বাসটুকু অন্তত আদায় করা যে তারা নীতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি। সেই আশ্বাসটুকু পেলে রোহিঙ্গাদের রাজি করানোর দায়িত্বও হয়তো ভারত নেবে।”

“কিন্তু ভারতের পক্ষে সেটা তখনই করা সম্ভব যদি মিয়ানমারের কাছ থেকে আগে আশ্বাসটা পাওয়া যায়।”

“ফলে এই সফরে ভারত বিষয়টা অবশ্যই উত্থাপন করবে, কিন্তু মিয়ানমারের কাছ থেকে কতটা স্ট্রং কমিটমেন্ট বা জোরালো অঙ্গীকার পাওয়া যাবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে”, বলছিলেন নয়নিমা বসু।

ফলে ভারতের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলেও বাংলাদেশে বসবাসকারী ১০ লক্ষেরও বেশি ও ভারতের হাজার চল্লিশেক রোহিঙ্গার মধ্যে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কয়েকশো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরলেও ফিরতে পারেন।

কিন্তু সেই সংখ্যাটা হাজার বা লক্ষে পৌঁছবে এখনও এমন দূরতম কোনও ইঙ্গিতও নেই।

Please follow and like us:
error0
Tweet 20
fb-share-icon20
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)